ভারত কি মাফ পাবে?

যুক্তরাষ্ট্রের চোখরাঙানি ছিল। ভারতেরও ছিল উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। কী হয়, কী হয়—দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। শেষমেশ হয়েই গেল। অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা ‘এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ’ কেনার চুক্তিতে সই করল ভারত ও রাশিয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চোখের কাঁটা।

রাশিয়ার যেকোনো উত্থানেই যুক্তরাষ্ট্রের মর্মপীড়া শুরু হয়। আর সেই রাশিয়ার সঙ্গেই কিনা এমন ভাব জমাল ভারত? মোড়লের চোখরাঙানির তোয়াক্কা না করে একেবারে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কেনা। ভারত কি মাফ পাবে মোড়ল ট্রাম্পের কাছে?

বিশ্ববাজারে রুশ অস্ত্রসম্ভারের জোগান ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘কাউন্টারিং আমেরিকাজ অ্যাডভারসারিজ থ্রু স্যাংশন আইন’ বা ‘সিএএটিএসএ’ চালু করে। আইন অনুযায়ী, রুশ অস্ত্র যারাই কিনবে, তারাই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বে। ভারতের ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ না করার (ওয়েভার) আরজি যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কি এতে সাড়া দেবে?

যেভাবে চুক্তি

গত শুক্রবার ভারত সফররত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে রাজধানী নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ‘এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ’ কেনার চুক্তি সই হয়। প্রায় ৪০ হাজার কোটি রুপির এই চুক্তি ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে ৮টি ক্ষেত্রে অনুচুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে ‘গগনায়ন’ কর্মসূচি। ২০২২ সালে চাঁদে মানুষ পাঠাতে ভারতকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে রাশিয়া।

ভারত যখন রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ কিনতে আগ্রহ দেখায়, তখনই জোরেশোরে আপত্তি জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। হুমকি দিয়েছেন, রাশিয়ার কাছ থেকে বিমানবাহিনীর জন্য এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কিনলে ভারতকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কথাবার্তা চালিয়ে যায় ভারত। চুক্তি সইয়ের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানান। পুতিনও এই সম্পর্ককে অতুলনীয় মনে করছেন।

মন গলানোর চেষ্টা ভারতের

ট্রাম্পের মন গলানোর চেষ্টা যে ভারত করছে না, তা কিন্তু নয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, নিষেধাজ্ঞার আইন প্রয়োগ (ওয়েভার) না করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোর কূটনৈতিক ও সামরিক চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। ভারত ট্রাম্প প্রশাসনকে আশ্বস্ত করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা অস্ত্রগুলোর কার্যকারিতার গোপনীয়তা তারা রক্ষা করবে। ভারত প্রযুক্তিগত ও সংবেদনশীল সামরিক তথ্য তৃতীয় কোনো পক্ষকে দেবে না।

ট্রাম্পের কাছে মাফ পেতে চুক্তি সইয়ের আগে থেকেই চেষ্টা চালিয়েছে ভারত। সরকারি উচ্চপর্যায়ের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে আরও বলা হয়েছে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে মন্ত্রিসভার কমিটির বৈঠকের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি সফর করেছে ভারতীয় দল।

গত ২২ থেকে ২৩ আগস্ট ভারতীয় বিমানবাহিনীর (আইএএফ) উপপ্রধান এয়ার মার্শাল আর নামবিয়ারের (বর্তমানে পূর্বাঞ্চল বিমানবাহিনীর প্রধান) নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর শীর্ষ প্রযুক্তি দল যুক্তরাষ্ট্রে যায়। সেপ্টেম্বরের মাঝে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও আরও একটি দল যুক্তরাষ্ট্রে যায়।

এত যাওয়া-আসার উদ্দেশ্য ছিল একটাই। ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চেয়েছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনেই তারা রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কিনছে। তাই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কেনার বিষয়টি নিরাপত্তা রক্ষার প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করার অনুরোধ ভারতের।

যুক্তরাষ্ট্রের ভয়

এত সোজাভাবে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নাও দেখতে পারে। এস-৪০০ বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা। এর মাধ্যমে অন্য উড়োজাহাজ বা রাডারের অবস্থান ও তথ্য রেকর্ড করা যায়। এটি ৪০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত আঘাত প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমারু বিমান এফ-৩৫ লাইটিং-২–কে প্রতিরোধ করতে পারবে। এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের ভয়।

ভারতের যুক্তি ফেলে দেওয়ার নয়

প্রতিরক্ষাশক্তি বাড়ানোর যে যুক্তি ভারত দিয়েছে, তা ফেলে দেওয়ার নয়। ভারতের প্রতিবেশী দেশ চীনের কাছেও একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা রয়েছে। ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে। সীমান্ত নিয়ে নিয়মিত বিরোধ রয়েছে দুই দেশের মধ্যে। পাকিস্তান ও চীন ভারতের শত্রু। তাই প্রতিরক্ষাশক্তি বাড়ানোর জন্যই ভারত এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কেনাকে জরুরি মনে করছে।

ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ রাজীব নয়ন বিবিসিকে বলেন, হিসাব–নিকাশ করে ভারতকে এই ঝুঁকি নিতে হয়েছে। নিজেদের রক্ষা করতেই ভারতকে এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কিনতে হয়েছে।

ভারত আশা করছে, রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কেনা সত্ত্বেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার মন্তব্যে বিষয়টি গোলমেলে হয়ে উঠেছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী র‍্যান্ডাল শ্রিভার বলেন, বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপরই নির্ভর করছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি সফরের সময় ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হবে কি না, সে নিয়ে কোনো ইঙ্গিত দেননি।

ভারতের এই কথা যুক্তরাষ্ট্র একেবারে ফেলে দিতে পারবে না। ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সহযোগী পরিচালক প্রত্যুষ রাও বিবিসিকে বলেন, গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ভারতে পাঁচবারেরও বেশি অস্ত্র রপ্তানি করেছে। দিল্লির প্রতিরক্ষার প্রয়োজনেই এসব অস্ত্র রপ্তানির কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেটিও ভেবে দেখার বিষয়।

ভারতের এত দৌড়ঝাঁপের ফল কী হবে, তা বলা মুশকিল। দাবার শেষ চালটা ট্রাম্পের হাতেই। গত মাসে রাশিয়ার কাছ থেকে একই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা কেনায় মাফ পায়নি চীন। নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে চীনের ওপর। দেখার বিষয়, ভারতের কপালে কী আছে।