অলোক নাথ ধর্ষক!

‘বলিউডে এসব কী হচ্ছে! পর্দায় যাঁদের দেখে শ্রদ্ধায় মন ভরে যেত, যাঁদের মুখের সংলাপকে মনে হতো আমার বাবা বা বড় ভাই বলছেন। কিংবা কোনো সমাজসংস্কারক। আজ তাঁদের বিরুদ্ধে এসব কী শুনছি!’

টুইটারে লিখেছেন হিন্দি ছবি এবং টিভি সিরিয়ালের একজন দর্শক। যুক্তরাষ্ট্রের ‘#মিটু’ আন্দোলনের বাতাস বলিউডের গায়ে লেগেছে বেশ ভালোভাবেই। ভুক্তভোগীরা মুখ খুলছেন।

সবার সামনে এমন সব মানুষের মুখোশ খুলে দিচ্ছেন, যাঁদের এসব কাজের কথা কেউ কখনো ভাবতেও পারেনি। এবার অভিযোগের আঙুল বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা অলোক নাথের দিকে। অভিযোগকারী বিনতা নন্দা।

অলোক নাথের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্তার অভিযোগ করেছেন বিনতা নন্দা। তিনি ছোট পর্দার স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং পরিচালক ও প্রযোজক। বড় পর্দায়ও কাজ করেছেন। অলোক নাথের স্ত্রী ছিলেন তাঁর ভালো বন্ধু।

একসঙ্গে থিয়েটার করতেন। এ কারণে অলোক নাথের বাসায় তাঁর যাওয়া-আসা ছিল। গতকাল সোমবার ফেসবুকে তিনি একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, অলোক নাথের বাসায় এক পার্টিতে গিয়ে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। ঘটনাটি গত শতকের নব্বই দশকের মাঝামাঝি।

বিনতা নন্দার মতে, ‘অলোক নাথ মদ্যপ, অসভ্য আর বিরক্তিকর মানুষ। যেহেতু তিনি টেলিভিশনের জনপ্রিয় তারকা, তাই খারাপ কাজ, অপকর্ম, খারাপ ব্যবহার করেও তিনি সহজেই পার পেয়ে যান।’

এত দিন পরে বিনতা নন্দা কেন এসব কথা বলছেন? আইএএনএসকে তিনি বলেন, ‘১৯ বছর ধরে এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করেছি।’

তিনি আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করেন। ঘটনাটি ১৯৯৪ সালের। তখন জি টিভির অন্যতম জনপ্রিয় সিরিয়াল ছিল ‘তারা’। ওই সিরিয়ালের মুখ্য দুটি চরিত্রে অভিনয় করছিলেন অলোক নাথ ও নবনীত নিশান।

শুটিংয়ের সেটে অলোক নাথ নানাভাবে নবনীত নিশানকে হেনস্তা করতেন। ওই সময় সেটের সবাই চুপ করে থাকতেন। একসময় অলোক নাথের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কাছে নবনীত নিশান অভিযোগ করেন। কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পান। এরপর সিরিয়াল থেকে অলোক নাথকে বাদ দেওয়া হয়। ‘তারা’ সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট রাইটার ও প্রযোজক ছিলেন বিনতা নন্দা।

নিজের ব্যাপারে বিনতা নন্দা বলেন, ‘অলোক নাথের বাসার এক পার্টিতে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তখন তাঁর স্ত্রী ছিলেন শহরের বাইরে। আমরা যেহেতু একসঙ্গে থিয়েটার করি, তাই আমাদের কাছে এভাবে পার্টিতে দেখা করা খুব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেদিন পার্টিতে আমার গ্লাসে কিছু মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আমি যখন তাঁর বাসা থেকে বের হয়েছি, তখন রাত দুইটা। আমার সঙ্গে গাড়ি ছিল না। সেদিন কেউ আমাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার জন্য বলেনি। রাস্তায় আমি একাই ছিলাম। হঠাৎ অলোক নাথ গাড়ি নিয়ে আসেন। তিনি আমাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আমিও তাঁকে বিশ্বাস করেছি।

কিন্তু গাড়িতে ওঠার পর আমাকে জোর করে আরও মদ খাওয়ানো হয়। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরদিন ঘুম থেকে ওঠার পর আমার শরীরের নিচের অংশে খুব ব্যথা অনুভব করি। বুঝতে পারি, শুধু ধর্ষণ নয়, বর্বরতার শিকার হয়েছি আমি। ওই সময় বিছানা থেকে উঠতে পারছিলাম না।’

বিনতা নন্দা আরও লিখেছেন, ‘ঘটনাটি আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ওই সময় জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সবাই আমাকে ব্যাপারটি চেপে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে।’

এখানেই শেষ নয়, অলোক নাথ এরপরও বিনতা নন্দাকে আরও কয়েকবার কুপ্রস্তাব দিয়েছেন। বিনতা নন্দা বলেন, ‘ওই ঘটনার পর আমি টিভির আরেকটি সিরিয়াল লেখা ও পরিচালনা করার কাজ পাই।

সেখানে গিয়ে দেখি, অলোক নাথ এই সিরিয়ালেও একটি গুরুত্বপূর্ণ রোল নিয়ে বসে আছেন। তখন আমাকে পরিচালনা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য প্রযোজককে অনুরোধ করি। কারণ আমি তাঁর সামনে যেতে চাইনি। এরপর এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যাতে আমি হুমকির মুখে থাকি। তখন অলোক নাথ আমাকে আবারও তাঁর বাসায় ডাকেন।

আমি যাই। আমার ওপর সে চড়াও হয়। আমি তাঁকে সেই অনুমতি দিয়েছিলাম। কারণ সিরিয়ালের কাজটা হারাতে হোক, সেটা আমি চাইনি। ওই সময় আর্থিক দিক থেকে আমার খুব টানাটানি চলছিল।’

সবার উদ্দেশে বিনতা নন্দা বলেন, ‘নিজেকে পিছিয়ে রাখবেন না। এটা পরিবর্তনের সময়। তাই আপনার-আমার নীরবতা একটা বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলে ফেলুন। চিৎকার করে বলুন।’

এদিকে বিনতা নন্দার অভিযোগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অলোক নাথ আর তাঁর অপকর্মের বিরুদ্ধে নিন্দা ও ধিক্কারের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। কেউ কেউ তাঁকে ‘সংস্কারি বাবুজি’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন। কারণ, পর্দায় তাঁকে সেভাবেই উপস্থাপন করা হয়।

নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে তনুশ্রী দত্তের যৌন হয়রানির অভিযোগের পর আজ মঙ্গলবার অলোক নাথের বিরুদ্ধে বিনতা নন্দার ধর্ষণের অভিযোগ বেশি আলোচিত হচ্ছে।

ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সিনে অ্যান্ড টিভি আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিনটা)। সংগঠনটির পক্ষে সুশান্ত সিং আজ এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, অলোক নাথকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁকে এর জবাব দিতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।