সুবিধাভোগী একজনই

৫,৫০০ কোটি টাকার ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, ঋণের সুবিধাভোগী ইউনুছ বাদল একাই।

এ্যাননটেক্সের বেনামি ঋণ

গত ৮ আগস্ট জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৫৩৪ তম সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়

যদিও ব্যাংকটির আইন উপদেষ্টা, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্মত নয়

জনতা ব্যাংকের আলোচিত এ্যাননটেক্স গ্রুপের সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুবিধাভোগী একজনই। আর তিনি হলেন এ্যাননটেক্স গ্রুপের কর্ণধার ইউনুছ বাদল। গত ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এক চিঠিতে এ তথ্য তুলে ধরেছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদ।

এত দিন নামে–বেনামে ইউনুছ বাদলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া জনতা ব্যাংকের ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণের সুবিধাভোগী নিয়ে এক ধোঁয়াশা ছিল।

জানা গেছে, জনতা ব্যাংক যে ২২টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছিল তার মধ্যে চারটি ছিল এ্যাননটেক্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ফলে এসব কোম্পানির কর্ণধার হিসেবে ইউনুছ বাদলকে ঋণের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ ছিল। এ চার প্রতিষ্ঠানকে জনতা ঋণ দেয় প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

কিন্তু বাকি ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। যেসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় কাগজে–কলমে ছিলেন অন্যরা। ফলে এসব ঋণও বেনামে মূলত ইউনুছ বাদলই নিয়ে গেছেন। আর জনতা ব্যাংক উদার হস্তে এ ঋণ বিতরণ করেছে আইন লঙ্ঘন করে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক কোনো একক ঋণ গ্রহীতাকে মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না। গত জুনের শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ছিল ২ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।

সেই হিসাবে একক গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৬৭৯ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিতে পারার কথা না। কিন্তু জনতা ব্যাংকে এ্যাননটেক্স গ্রুপের সহযোগী চার প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর বাইরে বেনামে ইউনুছ বাদলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরও ১৮ প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ। যদিও কাগজে–কলমে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার অন্যরা।

এ অবস্থায় ২২ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া জনতা ব্যাংকের ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণের সুবিধাভোগী কারা, তা জানতে চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের মধ্যে চিঠি চালাচালি শুরু হয়।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে গত মাসে জনতা ব্যাংক চিঠি দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই জানায়, ২২ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া এসব ঋণের সুবিধাভোগী মূলত একজনই, তিনি ইউনুছ বাদল। যদিও ব্যাংকটির আইন উপদেষ্টা, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্মত নয়।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের এমডি আবদুছ ছালাম বলেন, ‘ঋণের সুবিধাভোগীর বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামতসহ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আলোচনা হয়েছে। এরপরই তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে, ঋণের সুবিধাভোগী কয়জন। আমরা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’

এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি জনতা ব্যাংকের ‘একক ব্যক্তির ঋণে বৃহত্তম কেলেঙ্কারি’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশের পরই সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে চায়, এ ঋণের সুবিধাভোগী একজনই কি না? এরপরই বিশেষ তদন্ত শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। জনতা ব্যাংকও এ নিয়ে বিশেষ তদন্ত করে। এতেই বেরিয়ে আসে ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকলেও সুবিধাভোগী একজনই।

এরপর বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি পর্ষদ সভায় আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সব শেষ গত ৮ আগস্ট জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৫৩৪তম সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো জনতা ব্যাংকের এমডির চিঠিতে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের আইনজীবী মতামত দিয়েছেন, ২২ প্রতিষ্ঠান একই গ্রুপভুক্ত নয়। এ ছাড়া আরজেএসসির নথিতেও এসেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো একই মালিকের নয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও জনতা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এসেছে সব প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী একজনই, তিনি ইউনুছ বাদল।

এদিকে এ্যাননটেক্সের এ ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও সে টাকা শোধ হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে জনতা ব্যাংকই বিদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ শোধ করে দিয়েছে। এর বিপরীতে গ্রাহকের নামে ব্যাংক ডিমান্ড ঋণ তৈরি করেছে।

এসব অর্থ শোধ করছে না গ্রাহকের প্রতিষ্ঠানগুলো। এভাবে ননফান্ডেড (সরাসরি ঋণ নয়) সুবিধা দেওয়া সব ঋণই এখন ফান্ডেড ঋণে (সরাসরি ঋণ) পরিণত হয়েছে। আবার ব্যবসা পরিচালনা জন্য সিসি ঋণ (চলতি মূলধন) সহায়তা দেওয়া হয়, তবে প্রতিষ্ঠানগুলো সে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। এসব ঋণ পরবর্তীকালে মেয়াদি ঋণে পরিণত হয়।

এসব ঋণ আবার দফায় দফায় খেলাপি হয়েছে, পুনঃ তফসিল, পুনর্গঠন সব সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। এরপরও সময়মতো অর্থ ফেরত আসছে না। এখনো প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

আবদুছ ছালাম আজাদ এ নিয়ে বলেন, ‘তাদের একটা অংশ খেলাপি হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে খেলাপি না হয়, এ জন্য নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ জনতা ভবন করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন এমডি আবদুছ ছালাম আজাদ। এসব ঋণের বড় অংশই তিনি শাখা ব্যবস্থাপক থাকাকালীন সৃষ্ট।

এ্যাননটেক্সের নিজের নামে থাকা প্রতিষ্ঠান চারটি হলো—সুপ্রভ কম্পোজিট, সিমরান কম্পোজিট, লামিসা স্পিনিং ও গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং। এ ছাড়া গ্রুপটির কর্ণধারের সুবিধাভোগী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সিমি নিট টেক্স, এফকে নিট, জারা নিট টেক্স, গ্যাট নিট টেক্স, জেওয়াইবি নিট টেক্স, এম এইচ গোল্ডেন জুট মিলস, জ্যাকার্ড নিট টেক্স, স্ট্রাইগার কম্পোজিট, আলভী নিট টেক্স, এম নূর সুয়েটার্স, সুপ্রভ স্পিনিং, জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিং, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিং, এ্যাননটেক্স নিট টেক্স, শবমেহের স্পিনিং, শাইনিং নিট টেক্স, জারা ডেনিম ও সুপ্রভ রোটর স্পিনিং। এ্যাননটেক্সের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে জনতা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটেছে।


     আরও দেখুনঃ