কী হয়েছিল সেদিন রাতে

79

হুইলচেয়ারে করে বসার ঘরে এলেন অহনা। গায়ে চাদর জড়ানো। হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সামনে এসেই বললেন, ‘আমি কয়েক রাত ধরে ঘুমাতে পারছি না। এই ঘটনা এমনভাবে মাথায় আটকে আছে যে ঘুম আসে না কিছুতেই।’

আমরা সেই ঘটনা শুনতেই এসেছি। অহনা বলেন, ‘আমার এক বন্ধুর গায়েহলুদ ছিল পুরান ঢাকায়। গায়েহলুদে অনেক রাত পর্যন্ত ছিলাম। সেটা শেষ করে আমরা দুইটা–আড়াইটার দিকে বের হই। আমিই গাড়ি চালাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল খালাতো বোন লিজা মিতু। হাউস বিল্ডিং হয়ে ৭ নম্বরে সেক্টরে যখন পৌঁছাই তখন রাত তিনটা বেজে গেছে।

গাড়ি চালানোর সময় আমি খুব সতর্ক থাকি। রাতে আরও বেশি থাকি। কারণ, রাতে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে বলে অনেকেই বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়। আমি ৭ নম্বর সেক্টরের মোড় থেকে বাসার দিকে গাড়ি ঘোরাই। আমার বাসা ১৩ নম্বর সেক্টরে। আমার পেছনে ছিল একটা পাথরবোঝাই ট্রাক। আমি দেখতেই পারছিলাম সব। হুট করে দেখি, ট্রাকটা আমাকে ওভারটেক করছে। সেটা করতে গিয়ে আমার গাড়ির সামনের অংশে লাগিয়ে দেয়। আমি গাড়িটা একটু আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে নেমে যাই।’

এতটুকু বলে একটু থামেন অহনা। অনেকক্ষণ কথা বলতে বলতে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বলেন, ‘জানেন, আমার শরীরে কোথাও ভাঙেনি। কিন্তু টিস্যু ছিঁড়ে গেছে। খুব ব্যথা হয়। এভাবে দুর্ঘটনায় না পড়লে বুঝতাম না মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়ে।’ গলা ধরে আসে অহনার। থেমে যান। আমরা জানতে চাই, আপনি নেমে গিয়ে চালককে কী বললেন?

‘চালককে বলার আগে আমি লিজাকে বলি, ভিডিও করতে। তারপর নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, এটা কী করলেন? উত্তর দেয়, ‘যা করছি ঠিকই আছে।’ আমি তাকে নেমে আসতে বলি। নামে না। ট্রাকটা উঁচু হওয়ায় নিচ থেকে ঠিকমতো কথা বলা ও শোনা যাচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে ট্রাকের পা রাখার জায়গায় দাঁড়িয়ে যাই। এবার চালকের পাশে বসে থাকা সহকারী আমাকে দেখে। তারপর চালককে বলে, ‘ওস্তাদ, এটা কিন্তু নায়িকা, উনি বেঁচে গেলে কিন্তু আমরা ফেঁসে যাব!’

এটা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। একটা ১৪-১৬ বছরের ছেলে এভাবে বলতে পারল! এর মধ্যে আমার বোনকে বলি পুলিশকে কল দিতে। ও ভিডিও বন্ধ করে কল দিতে নেয়। তখনই ট্রাকটা টান দেয় চালক। বোন দ্রুত একপাশে সরে যায়। আমি শক্ত করে ট্রাকটা ধরে রাখি। আমি ছিলাম সড়কদ্বীপের পাশে। দ্বীপজুড়ে একটু পরপর ল্যাম্পপোস্টের পিলার।

চালক শুরুতে আমাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। পারে না। তখন সে ট্রাক চালিয়ে বিভিন্ন ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে আমাকে বাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত, বাবা-মায়ের দোয়াসহ সবার ভালোবাসা ছিল বলেই হয়তো একটা ল্যাম্পপোস্টেও আমার লাগেনি। এর মধ্যে পাশ দিয়ে আরেকটা ট্রাক চলে যায়।

এই চালক ওই চালককে বলে, ‘ওই এটাকে চাপা দে।’ আমি স্পষ্ট শুনতে পারছিলাম চালক আর ওর সহকারী কথা বলছে, আমাকে কোনোভাবে নিচে ফেলে দিতে পারলে আমাকে পিষে ফেলা যাবে। তখন যদি ও কোনোভাবে দরজাটা খুলত তাহলে আমি পড়ে যেতাম। কিন্তু কোনো কারণে হয়তো ওর এটা মাথায় আসেনি।

আমি যে কীভাবে তখন শক্ত করে এই ঠান্ডার মধ্যে ট্রাকের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম তা এখন আর বলতে পারব না। ওরা ট্রাকটা নিয়ে সোজা ১২ নম্বর সেক্টরের আগে রেডিকেল মেডিকেলের সামনে নিয়ে যায়। এর মধ্যে চালক তার সহকারীকে একটা জায়গা দেখিয়ে বলে, ‘এটাকে গাড়িসহ এখানে ফেলে দেব। যদি বেঁচে যায় যাবে, আর মরে গেলে তো গেলই। তোকে যখন বলব তখন দৌড় দিবি।

যে জায়গাটার কথা বলে সেটা অ্যারোমা নামে একটা সুপারশপের পাশে। অনেকগুলো কাচ রাখা। আমি তাদের কথাবার্তা সবই শুনতে পারছিলাম। ওই সময় আমি সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছিলাম আর আমার মায়ের মুখটা মনে পড়ছিল। ভাবছিলাম, একটু পরই মরে যাব। তখন ও ট্রাকটা কষে ব্রেক করে সেই কাচের ওপর ফেলে দেয়। আমি ছিটকে এক পাশে চলে যাই। আমার সৌভাগ্য যে কাচের ওপর পড়িনি। পড়লে হয়তো এখন আপনার সামনে বসে কথা বলতে পারতাম না।’

এই ছিল সেদিন রাতের ঘটনা। তারপর হাসপাতাল, থানা-পুলিশ সবই হয়েছে। আটক হয়েছে চালক ও সহকারী। মামলা তুলে নেওয়ার অনুরোধ–হুমকি সবই এসেছে অহনার কাছে। তবে এসব নিয়ে অহনা আপাতত ভাবছেন না। সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন নিজের সুস্থতার জন্য।

কথা শেষ করার সময় অহনা দুটো অনুরোধ করে বলেন, ‘অনেকেই আমাকে ভুল বুঝেছেন। অনেকেই ফেসবুকে বলাবলি করছেন, এত রাতে একটা মেয়ে কোথা থেকে ফিরছে। আমি কি করে জানলাম ট্রাকচালক মাতাল ছিল? আমি শুধু বলব, আমি তো ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমি তো বুঝেছি। একটা মানুষ তো যেকোনো কাজেই বাইরে থাকতে পারে, সেটা ছেলে হোক বা মেয়ে। আত্মীয়স্বজনের অসুস্থতা থাকতে পারে, দাওয়াত থাকতে পারে। তাই সবার প্রতি অনুরোধ, ভুল বুঝবেন না।’