আসছে আয়রন-জিংকসমৃদ্ধ নতুন ধান

71

আয়রন ও জিংকসমৃদ্ধ একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো উদ্ভাবিত এ জাতের চালের মূল উপাদানের (এন্ডোপ্লাজম) মধ্যেই মানবদেহের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপ্রাণ সম্পৃক্ত থাকবে। তাই এ ধান ভাঙানোর সময় আয়রন ও জিংক তুষের সঙ্গে চলে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই নেই।

ব্রি ধান-২৮ ও ২৯ এর জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে যৌথভাবে এ জাতটি উদ্ভাবন করেছে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র (ইরি) ও বাংলাদেশ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। এখন এ জাতের পরিবেশগত প্রভাব ও চাষবাদ সংক্রান্ত সফলতার বিষয়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

ব্রি’র বিজ্ঞানী ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে পাঁচটির মতো জিংকসমৃদ্ধ ধান রয়েছে। তবে ধান ভাঙনোর সময় তুষের সঙ্গেই জিংক চলে যায়। আর আয়রন সমৃদ্ধ একটি জাতেরও একই অবস্থা। জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে চালের মূল উপাদানে (এন্ডোপ্লাজম) আয়রন ও জিংকসমৃদ্ধ নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এতে প্রান্তিক মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান আয়রন ও জিংক জোগান দেয়া সম্ভব হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে নতুন জাতের উদ্ভিদ বা ফসলের জাত উদ্ভাবন ও মাঠ পরীক্ষা সংক্রান্ত গবেষণার বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল কমিটি অন বায়োসেফটি (এনসিবি)। নতুন জাতের ধানের বীজ আনা আনা বা গ্রহণ এবং কোনো জাতের মাঠের নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা (সিএফটি) স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ওই কমিটিতে পাঠানোর আগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটি অন ক্রপ বায়োটেকনোলজির (এনটিসিসিবি) সুপারিশ নেয়া প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি নতুন জাতের ধানের বীজ গ্রহণের জন্য এনটিসিসিবির কোর কমিটির সুপারিশ নেয়া হয়েছে। কমিটি নতুন এ জাতটি গ্রহণ ও ব্রির গ্লাস বা গ্রিন হাউজে পরীক্ষা সম্পাদনে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এনসিবিতে পাঠানোর সুপারিশ করে।

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটি অন ক্রপ বায়োটেকনোলজির সভায় এ বিষয়ে আমরা আলোচনার পর তা এনসিবিতে পাঠিয়েছি। এখন আয়রন ও জিংকসমৃদ্ধ এ ধানের জাতটি উন্মুক্ত করার বিষয়টি তারা বিবেচনা করবে।’

ব্রি-র মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে জিংকসমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবন করেছি। এ রকম পাঁচটি জাত রয়েছে। তবে আয়রন সমৃদ্ধ সেভাবে কোনো ধান নেই। তবে ব্রি ধান-৮৪ এর কিছু আয়রনও আছে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন যে জাতটি আমরা আনছি তাতে জিংক ও আয়রন থাকবে, এই জাতটি ট্রান্সজেনিক হবে। অর্থাৎ জিন ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে এটা করা হচ্ছে। যেটাকে আমরা জিএম (জেনেটিক্যালি মডিফাইড) ক্রপ বলি। কারণ আয়রন ও জিংক থাকে সাধারণত ধানের উপরের অংশে যেটাকে আমরা কুড়া বলি। পলিশ করলেই এটা আর থাকে না। নতুন জাতে আয়রন ও জিংক চালের এন্ডোসফর্মে থাকবে। এটা পলিশ করলেও আর সমস্যা হবে না। এতে জিংক ও আয়রন চালের মধ্যেই থাকবে।’

‘এটার এখন ট্রায়াল হবে, পারফরমেন্স ইভ্যালুয়েশন হবে। এনভায়রনমেন্টার পারফরমেন্স, এগ্রো-ইকনোমিক পারফরম্যান্স এগুলো দেখা হবে। এরপর রিলিজ হওয়ার সময় এটার নাম দেয়া হবে। ব্রি ধান-১০০ এটার এমন নাম হতে পারে’ বলেন বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী শাহজাহান কবীর।

ব্রি’র মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘গ্রামের অতি দরিদ্র মানুষটি তো ফল কিংবা ডিম কিনে খেতে পারে না। কিন্তু ভাতটা তো সে খাবে। আমরা যদি ভাতের মধ্যে প্রয়োজনীয় আয়রন ও জিংক দিয়ে দিতে পারি, তবে বাড়তি কিছু ছাড়াই তার এসবের অভাব পূরণ হবে। এটাই হচ্ছে এ ধান উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য।’

তিনি বলেন, ‘এ ধানের ফলনও ভালো হবে। কারণ ফলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সেকরিফাইস নেই।’

আয়রন ও জিংকসমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যের বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন কর্মকর্তা জানান, বিশ্বব্যাপী মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অভাব বা ‘পুষ্টি স্বল্পতাজনিত ক্ষুধা’৩৮ শতাংশ গর্ভবতী নারী এবং ৪৩ শতাংশ স্কুলে যায় না এমন শিশুদের উপর প্রভাব ফেলে। এবং এ সমস্যা উন্নয়নশীল দেশে সর্বাধিক।

তিনি আরও জানান, বিশ্বের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি এনিমিকের (রক্তশূন্যতা) প্রায় অর্ধেকই আয়রনের অভাবে হয়। রক্তশূন্যতা বাচ্চা ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং এ থেকে গুরুতর স্বাস্থ্যহানি হতে পারে। এ ছাড়া এনিমিয়া শিশুদের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশের প্রায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক স্কুল শিশু এবং ৭ দশমিক ১ শতাংশ অগর্ভবতী আয়রনের অভাবে ভোগে। ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক স্কুল শিশু এবং ৪ দশমিক ৮ গর্ভবতী নয় এমন নারী আয়রন ঘাটতি এনিমিয়ায় ভোগে।

প্রায় ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাক স্কুল শিশুদের এবং ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ গর্ভবতী নন এমন নারী জিংকের অভাবে ভুগছে। যদি ছাঁটাই করা চালে ১০ পিপিএম আয়রন এবং ২৮ পিপিএম জিংক থাকে। তাহলে মানবদেহে আয়রন ও জিংকের চাহিদার ৩০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

এ ধান উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িত একজন কর্মকর্তা বলেন, আগে তুষের সঙ্গে বেশিরভাগ আয়রন ও জিংক চলে যেত। বর্তমানে প্রস্তাবিত ধানের জাতের ক্ষেত্রে আয়রন ও জিংক এন্ডোপ্লাজমে (কোষ পর্দার কেন্দ্রের দিকে অপেক্ষাকৃত ঘন ও দানাদার স্তর) স্থানান্তর করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আয়রন ও জিংকের পরিমাণ বজায় থাকবে।