Avatar

কাউকে তোয়াক্কা করেন না নকলার ডাক্তাররা

111

১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা। ৫০ শয্যার নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেল, গাইনি চিকিৎসকের খোঁজে এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করছেন ১০-১২ নারী। এর মধ্যে গর্ভবতী মা রয়েছেন দুই-তিনজন; কিন্তু খোঁজ নেই গাইনির জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আফসানা রওশনের। জানা গেছে, তার স্বামী ডা. মোহাম্মদ আলী ড্যাবের নেতা ছিলেন।

যার সূত্র ধরে কাউকে তোয়াক্কা করেন না তিনি। থাকেন ঢাকায়। আসেন ইচ্ছামতো। বেতন নিয়ে চলে যান। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তার কথাও শোনেন না। ৫০ শয্যার নতুন হাসপাতাল ভবনে সিজার ও প্রসবের জন্য অপারেশন থিয়েটারে সব ব্যবস্থা থাকলেও গত ৫ বছর অপারেশন থিয়েটার চালু হয়নি এই ডাক্তারের অনিচ্ছার কারণে। এমন আরেক দাপুটে ডাক্তার শেরপুর জেনারেল হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মোশাররফ হোসেন। দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে যান।

১৩ ফেব্রুয়ারি ডা. আফসানার খোঁজে ফের নকলা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, তিনি কর্মস্থলে নেই। হাসপাতালের এক কর্মচারী জানালেন, ২০১২ সালের ১ আগস্ট যোগদানের পর কোনো দিনই সময়মতো হাসপাতালে আসেননি তিনি। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবে উৎসাহিত করতে সিজার করান না। তবে অনেক রোগীর অভিযোগ, প্রসবজটিলতা থাকার পরও ডা. আফসানা সিজার করেন না। ফলে বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে সিজার করাতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নকলা হাসপাতালে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র সাতজন। এর মধ্যে সার্জারি চিকিৎসক মুক্তি মাহমুদ যোগদানের পর ২০১৫ সালের ৭ জুলাই থেকে ডেপুটেশনে শেরপুর জেলা হাসপাতালে ও ডা. আকলিমা আক্তার আঁখি সম্প্রতি নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজে যোগদান করেছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ অন্য চিকিৎসকদের এদিন কর্মস্থলে পাওয়া গেছে।

শেরপুর জেনারেল হাসপাতাল :সরেজিমিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ১০০ শয্যার শেরপুর জেনারেল হাসপাতালে মেডিকেল অফিসারদের কর্মস্থলে পাওয়া গেছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যে সার্জারি ও চক্ষু কনসালট্যান্টের হদিস পাওয়া যায়নি।

নালিতাবাড়ী উপজেলার নকশী গ্রামের গৃহবধূ বাসন্তী রানী বলেন, ‘এক মাস আগে চোখ দেখাইতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মোশাররফ হোসেনের কাছে আমার ৭৫ বছর বয়সী শাশুড়িকে নিয়ে আসি। তিনি কয়েকটি টেস্ট দিলেন। এরপর আরেক দিন আইসা সারাদিন বইসা থাইক্কা তার দেখা পাই নাই। আইজ সকাল ৮টা থেকে বইসা আছি। তার দেখা নাই।’ ওই গৃহবধূ বলেন, ‘তিন দিনে সাড়ে ৪০০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিলাম। নিজেদের টাকায় টেস্ট করলাম; কিন্তু ডাক্তার দেখাইতে পারতাছি না। অথচ হাসপাতালে বইসা ওই ডাক্তার আমার সামনে রোগীদের তার ক্লিনিকে যাবার কয়।’

ডাক্তার দেখাতে আসা ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদী গ্রামের বাসিন্দা দুদু মিয়া (৭০) ও সফুরা বেগম (৭২) বলেন, ‘এক মাস আগে আমার এক চোখ অপারেশন হইছে। চোখের অবস্থা ভালো না। ডাক্তার দেখাইতে আইছি। ডাক্তার নাই। কি করমু বুছতাছি না। ডাক্তার সময় দিছে। তাই ৩০ কিলোমিটার দূর থেইক্কা আইলাম। অহন হুনি তিনি নাই। আমগরে যন্ত্রনা দেহার কেউ নাই।’

এ ব্যাপারে চিকিৎসক মোশাররফ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমি ছুটিতে আছি। যা বলার সিভিল সার্জনকে বলুন।’ রোগীদের সময় দিয়ে কেন আপনি কর্মস্থলে নেই- জানতে চাইলে তিনি আরও ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘এর জবাব আপনাকে দেব না।’

নালিতাবাড়ী : এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায় সকাল থেকে মাত্র একজন ডাক্তার ৫০ শয্যার হাসপাতালের দুই-তিনশ’ রোগীকে সামাল দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে ডা. কামরুজ্জামান রাশেদ বলেন, ‘২০ ডাক্তারের সেবা দিচ্ছি আমরা মাত্র চারজন। তিন চিকিৎসককে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমূদুল বাশার শেরপুর গেছেন। তাই আমাকেই সব দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।’

চিকিৎসাসেবা নিতে আসা উপজেলার বাগিচাপুর গ্রামের মোমেনা বেগম বলেন, ‘ছোট বাচ্চা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরম দুর্ভোগ পোহানোর পর যে সেবা পাচ্ছি, সেটা বলার মতো নয়।’

এ ব্যাপারে ডা. মাহমূদুল বাশার বলেন, সিভিল সার্জন আমাকে সব ডাক্তারকে নিয়ে প্রশিক্ষণে যেতে বলেছেন। তাই তার নির্দেশ পালন করেছি। এখানে আমার কিছু করার নেই।

ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী : এ দুই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে একই চিত্র পাওয়া গেছে। ঝিনাইগাতী হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আট চিকিৎসকের মধ্যে গাইনি কনসালট্যান্ট ডা. মায়া হোড় ও ডা. মোমেনা খানম উপস্থিত রয়েছেন। বাকি দু’জন মেডিকেল অফিসারকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু হাসান শাহীন শেরপুরে প্রশিক্ষণে আছেন। অন্যদের ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। শ্রীবরদী উপজলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দুই চিকিৎসককে কর্মস্থলে পাওয়া গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা অপর তিন চিকিৎসক প্রশিক্ষণের জন্য শেরপুর সিভিল সার্জন অফিসে রয়েছেন বলে জানান কর্মচারীরা।

এসব ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. রেজাউল করিম বলেন, আর্সেনিকবিষয়ক প্রশিক্ষণের জন্য মঙ্গলবার পাঁচ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের একবেলা প্রশিক্ষণ ছিল। তাই তারা কর্মস্থলে ছিলেন না। তিনি বলেন, দু’জন কনসালট্যান্ট চিকিৎসক ছুটিতে গেছেন। তাই তাদের পাওয়া যায়নি। যারা অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে থাকবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here