গণতন্ত্র, সুশাসন না থাকলে উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে- আকবর আলি খান

72

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেছেন, বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি, তাতে গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়ন একসঙ্গে হবে না। কিন্তু এই তিনটিই দরকার। সবার আগে দরকার গণতন্ত্র। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সুশাসন নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সুশাসন জরুরি।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ শীর্ষক পর্বে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের এ পর্বের আলোচনায় বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করেন। তারা বলেন, বর্তমানে দেশে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা চলছে। ক্ষমতাসীন দল শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত শ্রেণিগুলোকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে ক্ষমতায় থাকছে। পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে। আবার জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করার উদ্যোগে নতুন ধরনের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বাম দলগুলো সক্রিয় ভূমিকা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান।

আকবর আলি খান আরও বলেন, বাংলাদেশে দল ওপর থেকে পরিচালিত হয়। নিচে যারা থাকে, তারা হালুয়া-রুটি ভাগাভাগি করে। দলে বিরোধী মত থাকে, বিতর্ক থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে তা দেখা যায় না। এ জন্য দেশে গণতন্ত্র আছে কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সাবেক এই আমলা বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে, তবে তা ত্রুটিপূর্ণ। এ মুহূর্তে মানুষের অধিকার রক্ষায় সংসদ ঠিকমতো কাজ করছে না। এ জন্য অংশীদারিত্বমূলক গণতন্ত্র দরকার। একই সঙ্গে রাজনীতির অমীমাংসিত প্রশ্নে গণভোট দরকার। তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলই তৃতীয় শক্তির উত্থান চায় না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার পরিবর্তন না হলে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব হবেই। এই তৃতীয় শক্তি নাগরিক সমাজ নয়।

মূল প্রবন্ধে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিকস ক্লাস্টারের প্রধান মির্জা এম হাসান বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে সর্বোচ্চ নেতৃত্বই সবকিছু ঠিক করে। যে কারণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। সংসদ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ভারসাম্য নেই। তিনি বলেন, দেশে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে তাতে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা নেই। এ ধারা ২০১৩ সালে শুরু হয়নি, বরং ১৯৯১ সালেই শুরু হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এমন, যার মাধ্যমে তৃতীয় শক্তি জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক দলগুলো অনিশ্চয়তার জন্য এই ব্যবস্থা পছন্দ করে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, আগে দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতো। দুটি দল ঘুরেফিরে ক্ষমতায় আসত। এখন আর তা নেই। পাশাপাশি শাসন ব্যবস্থার পুরোটাই যে সরকারি দল নিজের পক্ষে নিতে পেরেছে, তা নয়। সরকার শাসন ব্যবস্থার তিন ব্লকে (রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলা) আটকা পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, আগে বলতাম, দেশে গণতন্ত্রে ঘাটতি আছে। এখন বলছি, গণতন্ত্রে ত্রুটি আছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার সব সূচকেই পেছনে পড়েছে।

একটি পর্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আলোচকদের প্রশ্ন করেন। তাদের প্রশ্নের মধ্যে ছিল মধ্যবিত্তরা কেন আন্দোলনে আসছে না। জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হলে সমাজ ও রাজনীতিতে প্রভাব কী হবে। অভিভাবকরা তরুণদের রাজনীতিতে নিরুৎসাহিত করছেন কেন।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক রওনক জাহান বলেন, দেশে আন্দোলন হচ্ছে। তবে এসব আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক শক্তি নেই। এমনকি নিরাপদ সড়ক, কোটা সংস্কারের মতো জনস্বার্থ সম্পৃক্ত আন্দোলনেও রাজনৈতিক শক্তি সম্পৃক্ত হচ্ছে না। এ অবস্থায় সবাই বাম দলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এটা অবশ্য ইতিবাচক।

এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এম এম আকাশ বলেন, বিএনপি সক্রিয় নয়। বাম দলগুলো এতদিন বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করেছে। এদিকে এক ধরনের ইসলামিক শক্তি এগোচ্ছে। বামপন্থিদের আসতে হলে একটা যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ফ্রন্ট দরকার।