বদলেছে কক্সবাজার জেলা কারাগারের চিত্র

Avatar
নিজাম উদ্দিন, সিনিয়র রিপোর্টার
৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ, মে ১৫, ২০১৯

কক্সবাজার সদরের জালালাবাদের মো. ফিরোজ (ছদ্মনাম)।একটি মিথ্যা হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান তিনি। এ যাত্রায় ৩ মাস কারাভোগের পর বের হয়েই কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে ডেকে কারাগারের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে প্রতিবেদন করান। এটি ২০১৪ সালের কথা।

সম্প্রতি তিনি একই ধরনের মামলায় আবারও কারাগারে যান। ১৫ এপ্রিল জামিনে বের হয়ে আসেন। বের হয়েই তার পরিচিত সেই গণমাধ্যম কর্মীদের খোঁজ করে এবার বললেন, ২০১৪ সালের অভিযোগের উল্টো চিত্র।

তার মতে, আগে কারাগারে ঢোকামাত্রই বিভিন্ন সেলের ইনচার্জ কর্তৃক আসামি ক্রয় হতো। এখন সে পরিস্থিতি নেই। আগেরবার স্বাভাবিক রান্না করা খাবার মুখে দেয়া যেত না, তাই অধিকাংশ খাবার ড্রেনে ফেলে দিত বন্দীরা। কিন্তু এখন স্বাভাবিক খাবার যত্ন করেই খাচ্ছে বন্দীরা। আগেরবার দেখেছেন গাঁজা-ইয়াবার আসর বসানো হতো, এখন ধুমপান থাকলেও ইয়াবা-গাঁজার বিকিকিনি নেই। আগে বিত্তশালী বন্দীদের টাকায় পাওয়া সুবিধা দেখে দরিদ্র বন্দীদের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার চিত্রও এখন আর নেই।ফিরোজের কথার সত্যতা স্বীকার করেছেন সদ্য কারামুক্ত শহরের পেশাদার অপরাধী তাহের কবিরসহ (ছদ্মনাম) অনেকে। কারামুক্ত বন্দীদের মতে, বর্তমান কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতায় বন্দীরা খাবার ও থাকা নিয়ে ভালো থাকলেও, কষ্ট পোহাচ্ছেন চিকিৎসক, বাথরুম ও সুপেয় পানি নিয়ে। ধারণক্ষমতার ৮ গুণ বন্দী প্রায় নিয়মিত থাকার কারণে এ অবস্থা ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে বলে তাদের অভিমত।

তবে দর্শনার্থীরা জানান, পর্যটন নগরীর জেলা কারাগার প্রাকৃতিক পরিবেশ ঘেরা ও নিরাপদ স্থানে হলেও প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী কারাগারে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কারান্তরীণ কারো সঙ্গে দেখা করতে হলে অপেক্ষা করতে হয় বিধায় গণশৌচাগার ও পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজন। এটি না থাকায় চরম সমস্যার সম্মুখীন হন নারী দর্শনার্থীরা।

কারা সূত্র মতে, কক্সবাজার জেলা কারাগারে আসামি ধারণক্ষমতা ৫৩০ জনের। গত ডিসেম্বর থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়ে গড়ে ৪ হাজারের বেশি বন্দী অবস্থান করছে। একাদশ নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক বন্দী বৃদ্ধি, প্রতিদিন মাদক সংক্রান্ত গ্রেফতার, মারামারি এবং অন্যান্য বন্দী আসায় হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এর উপর রয়েছে কারাগারে জনবল সংকটসহ নানামুখী সমস্যা।

সম্প্রতি কক্সবাজার কারাগার পরিদর্শন করেন মানবাধিকার চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। তিনি জেলের অভ্যন্তরে পরিপাটি পরিবেশ, দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কাজের দৃশ্যসহ সার্বিক পরিস্থিতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।কক্সবাজার কারাগারের জেলার রীতেশ চাকমা জানান, ১২ দশমিক ৮৬ একর আয়তনের মধ্যে কারাভ্যন্তরের পরিমাণ ৮ দশমিক ০৯ একর। বাইরের পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৭ একর। ২০০১ সালের ২৭ মে উদ্বোধন হওয়া কারাগারটির ধারণ ক্ষমতা ৫৩০ জন। যার মধ্যে ৪৯৬ পুরুষ এবং ৩৪ জন নারী বন্দী থাকার কথা। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে এ কারাগারে গড়ে বন্দী থাকছে ৪ হাজারের অধিক। এদের মাঝে ২৫০ জনের অধিক নারী বন্দী আর বাকিরা পুরুষ। রয়েছে ভারতীয় ২ নারী ২ পুরুষ বন্দীও। মিয়ানমার নাগরিক রয়েছে ৪৩৩ জন। বিদেশি বন্দীদের মাঝে ৫ জনের সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে।

কারা তত্ত্বাবধায়ক (জেল সুপার) মো. বজলুর রশিদ আখন্দ জানান, বর্তমান সরকারের চোখে কারাগার হলো অপরাধ শোধনাগার। তাই আলোর পথের যাত্রী করে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে বন্দীদের। তবে কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও ধারণক্ষমতার ৮ গুণ বেশি বন্দীকে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অবহিত করা হয়েছে। ধীরে ধীরে সব সমাধানের কাজ চলছে।

মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here