নতুন টাকা ও ঈদ ভাবনা

Avatar
দৈনিক২৪ | অনলাইন নিউজ পোর্টাল
৬:২৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ৪, ২০১৯

ঈদ মানেই নতুন টাকা। আর সেই টাকা দেখে অনেকের ভাবনায় হয়তো আসতে পারে, প্রতি ঈদেই কি নতুন টাকা ছাপা হয়?
আসলে প্রতি ঈদে নতুন টাকা ছাপা হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লি.’ টাকা ছাপায়।

ব্যবহারকারীর ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় টাকা ছেঁড়ে, পোড়ে কিংবা রং পরিবর্তিত হয়। এভাবে বিপুলসংখ্যক টাকা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন এসব টাকা পুড়িয়ে ফেলে। পুনঃপ্রচলনযোগ্য, অপ্রচলনযোগ্য ও ছেঁড়া নোট—এই তিন শ্রেণিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা রাখা হয়। কখন, কী পরিমাণ এবং কোন মূল্যমানের নোট ছাপা হবে, তার জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও হিসাবপদ্ধতি। টাকায় নকশা করতে দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পীদের সম্পৃক্ত করা হয়। সময়-সময় বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের নকশাও পরিবর্তন করা হয়। নোটগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করার পাশাপাশি নানা রকম নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আচ্ছাদিত করার প্রাণান্ত প্রয়াস লক্ষণীয়। মোদ্দাকথা, মুদ্রা ছাপানো নিয়ে নিরীক্ষা চলে নিয়মিত।

ঈদ যত এগিয়ে আসে, ব্যাংকের কাউন্টারে ভিড় তত বাড়ে। এই গ্রাহকদের সবাই কিন্তু নতুন টাকার খোঁজ পান না। আবার সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখাতেও সম হারে কচকচে টাকার দেখা মেলে না। ব্যবস্থাপনা কৌশল ও চাহিদার তুলনায় ছাপানো নতুন টাকা কম হওয়ায় এ সেবা পান অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালী গ্রাহকেরাই। ব্যবস্থাপক প্রয়োজনে অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা নতুন টাকা বিকিকিনির দোকান থেকে সংগ্রহ করে হলেও তা দিয়ে বিত্তশালী গ্রাহকদের চাহিদা মেটান। নতুন টাকায় বেতন পেলে কর্মচারী যেমন খুশিতে গদগদ হন, তেমনি বাঙালির চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঈদ সেলামিতে নতুন টাকা সর্বাধিক কাঙ্ক্ষিত। বর্তমানকালেই শুধু নয়, সেই মুঘল আমলেও সম্রাটেরা উৎসবে আমন্ত্রিত অভ্যাগতদের মুদ্রা উপহার দিতে পছন্দ করতেন। সম্রাট শাহজাহান উৎসবে আগত বিশিষ্টজনদের দিতেন ‘নিসার’ নামের এক বিশেষ ধরনের রুপার মুদ্রা। গোলায়িত মুদ্রার বর্গাকৃতি রেখার অভ্যন্তরে লিপি হিসেবে কালিমা উৎকীর্ণ হয়েছে। মুদ্রায় খোদিত পারসিক ক্যালিগ্রাফির নিপুণ নান্দনিকতা ও শিল্পসৌন্দর্য অদ্যাবধি মুদ্রা সংগ্রাহকদের মুগ্ধ করে।

নতুন নোট দিয়ে পবিত্র শাওয়ালের ঈদে ফিতরা দেওয়ার প্রচলন রয়েছে মুসলিম সমাজে। শুধু হতদরিদ্র বা শিশু-কিশোরদেরই নয়, নতুন টাকা বয়োবৃদ্ধদেরও মন ভালো করে দেয়। আমার প্রয়াত নানিশাশুড়ির নতুন টাকা সংগ্রহের এমন নেশা ছিল যে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে সেটার ক্ষতিপূরণ তাঁকে দিতে হয়েছিল কড়ায়-গন্ডায়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন ১০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাতিল ঘোষণা করে, সে সময় তাঁর সংগ্রহে থাকা নতুন নোটগুলো রাতারাতি অচল হয়ে যায়! নতুন কাগুজে মুদ্রার নান্দনিক সৌন্দর্য এর অব্যাহত চাহিদার অন্যতম কারণ।

রাশিয়ার অনলাইন বিনোদন পত্রিকা প্যান আর্মেনিয়ান ডট নেট পরিচালিত জরিপে, ২০১২ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কাগুজে মুদ্রা হিসেবে স্থান পেয়েছিল বাংলাদেশের দুই টাকার নোট। নোটটির এক পিঠে শহীদ মিনার এবং অন্য পিঠে গাছের ডালে বসা জাতীয় পাখি দোয়েলের ছবি উৎকীর্ণ। দুই টাকার এই নোটে অপরূপভাবে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি। ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে নোটটি যখন প্রথম বাজারে ছাড়া হয়, তখন অনেকে এর সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে দশ-বিশ টাকার বিনিময়েও দুই টাকার একটি নোট সংগ্রহ করেছেন। মাটির ব্যাংকগুলো ভরে উঠেছিল দুই টাকার নোটে।

একটা সময় পর্যন্ত কিন্তু নতুন কাগুজে মুদ্রা ছিল না। তখন প্রচলিত ছিল বিভিন্ন মানের ধাতব মুদ্রা। আঠারো শতকজুড়ে এবং উনিশ শতকের বেশ কিছুটা সময় ধরে মুদ্রা বিনিময় রীতিতে চলেছে চরম নৈরাজ্য। ঢাকা জেলা কালেক্টরেটের ১৭৮৭ সালের জরিপ অনুযায়ী ঢাকার বাজারে প্রচলিত ছিল মোট সাত ধরনের মুদ্রা। তবে এর মধ্যে আর্কট মুদ্রার প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশি। সেকালের দলিলপত্রে ‘আর্কট’ কে ‘দশ মাষা’ হিসেবে প্রকাশ করতেও দেখা যায়। পরবর্তী অবস্থানে ছিল ‘সিক্কা’ মুদ্রা। সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করা হতো সিক্কায়। আর ব্যবসায়িক লেনদেন হতো আর্কটে। নানা ধরনের মুদ্রার বিনিময় প্রথার এ কৌশলকে কাজে লাগিয়ে শ্রফ, শেঠ ও পোদ্দাররা ঢাকায় বিকশিত হয়। তারা মূলত মুদ্রা বিনিময়কারী ও অর্থলগ্নিকারী ব্যবসায়ী। এ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রাজস্ব পরিশোধের জন্য আমজনতা থেকে শুরু করে জমিদারশ্রেণি ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও সিক্কা সংগ্রহ করতে হতো। বিভিন্ন মানের প্রচলিত মুদ্রা মূল্যের হ্রাসবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাট্টার পরিমাণের পার্থক্য হতো।

ইতিহাসবিদ আবদুল করিমের তথ্যানুযায়ী, টাঁকশালের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির কারণে সে সময়ে উপমহাদেশে দুই শরও বেশি টাঁকশাল থেকে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা ছিল। এই টাঁকশালগুলোর মুদ্রার ওজন আবার সমান ছিল না। ওজন ও ব্যবহৃত ধাতুর উৎকর্ষের ওপর নির্ভর করে মুদ্রার দাম ঠিক করা হতো। মুদ্রা বিনিময় প্রথার এই জটিল পদ্ধতিতে জনসাধারণের ভোগান্তি ছিল চরম। পরিশেষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৫ সালে টাকার একটি একক মানের প্রচলন করতে সমর্থ হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ১৮৫৭ সালে কাগুজে মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। কালের পরিক্রমায় তিরোহিত হয়েছে বাট্টা ব্যবস্থা আর মহাজনী ব্যবস্থার চরম বিশৃঙ্খলা। বিকশিত হয়েছে মুদ্রা ব্যবস্থাপনা। ঈদ উৎসবে নোটের অতিরিক্ত চাহিদা পূরণে এ বছর ২২ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবাইকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা।

*হোসাইন মোহাম্মদ জাকি: গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ

মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here