মেহেরপুরে অ্যানথ্রাক্স রোগের প্রাদুর্ভাব

Avatar
নিজাম উদ্দিন, সিনিয়র রিপোর্টার
১:৩১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভিটাপাড়ার আমিরুল ইসলাম। গত ১০ দিন আগে তার বাড়ির একটি গরু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি সেটি জবাই করে মাংস বিক্রি করেন। তার দুইদিন পরই দুই হাতে ও মুখে ফোঁড়া ও পচন দেখা দেয়। স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন। ডাক্তার জানান, তিনি অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত।

গরু জবাইয়ে সহযোগী তার ভাই ইদ্রিস এবং ফজলুও এ রোগে আক্রান্ত হন। অপরদিকে মাংস রান্না করার সময় গরুর রক্ত ও বর্জ হাতে লাগায় স্ত্রী সালেয়ারা ও মেয়ে নারগিসও অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হন।

শুধু আমিরুলের পরিবার নয়, গোটা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গত ৯ মাসে ৫০১ জন অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হয়ে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। বিভিন্ন হাটবাজারে প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় স্থানীয় কসাইরা অসুস্থ গবাদি পশু জবাই করে মাংস বিক্রি করে। ওই মাংস খেয়েই লোকজন এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্তরা জানান, হাটবাজার থেকে গবাদি পশুর মাংস এনে রান্না করা ও খেয়ে এ রোগ দেখা দিয়েছে। মাংস খাওয়ার পরপরই মুখসহ বিভিন্ন অঙ্গ চুলকানি দেখা দেয়। তার পর ফুলে ও পানি ঝরে। পরে তারা জানতে পারেন এটি অ্যানথ্রাক্স রোগ।

গাংনী বাজারের মাংস ব্যবসায়ী হারেজ জানান, এই বাজার পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে। এখানে কোনো অসুস্থ পশু জবাই করা হয় না। কিন্তু অন্যান্য হাট বাজারে কোনো তদারকি নেই। ফলে রোগা ও অসুস্থ গরু জবাই করা সহজ। স্থানীয় লোকজনও রোগাক্রান্ত পশুর মাংস সস্তায় কিনে খায়। ফলে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

বামন্দি বাজারের কয়েকজন কসাই জানান, গত ১০ বছরে একদিনও পশু জবাইয়ের আগে পরীক্ষা করতে কোনো লোক আসেনি। কোনো নজরদারি নেই।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার সজীব উদ্দীন স্বাধীন জানান, সম্প্রতি গাংনী পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অ্যানথ্রাক্স রোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর মাংস কাটা, ছেড়া ও খাওয়ার কারণে সবাই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কেউ যাতে রোগাক্রান্ত গরু জবাই করতে না পারে সেজন্য নজরদারি প্রয়োজন।

গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা গোলাম জামান জানান, সবখানেই আ্যানথ্রাক্স জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় আছে। ৪০ বছর পর্যন্ত এরা বেঁচে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এবং তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এ জীবাণু সক্রিয় হতে পারে। বর্তমানে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ রোগের বিস্তার বেড়েছে। তাছাড়া লোকবলের অভাবে তেমন কোনো তদারকি করা সম্ভব হয় না। অনেকেই গ্রামে পশু জবাই করেন। অসুস্থ গবাদি পশুর মালিকরা নিজেরাই জবাই করে মাংস বিক্রি করেন। এখান থেকেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।

তিনি আরও জানান, লোকবলের অভাবে হাটবাজারে তেমন তদারকি করা হয়ে উঠে না। তবে যেসব এলাকায় অ্যানথ্রাক্স আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে সেখানে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে একটি দল এলাকা পরিদর্শনে এসে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছেন ও এলাকাবাসীকে পরামর্শ দিচ্ছেন।

এদিকে পরিদর্শক দলের প্রধান ঢাকার কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধানগারের (সিডিআইএল) কর্মকর্তা ডা. গোলাম আজম জানান, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় রোগীদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করেছেন এবং ফ্রিজে রাখা মাংস পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু পেয়েছেন। মাংসগুলো পুঁতে রাখা হয়েছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশু জবাই করে গভীর গর্তে পুঁতে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here