মূল সংবাদে যান
দৈনিক২৪ দৈনিক২৪

সম্মতিতে হওয়া ঘনিষ্ঠতাকে বিচ্ছেদের পর ধর্ষণ বলা যাবে না: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

দৈনিক ২৪ ডেস্ক

প্রকাশ:

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সংগৃহীত
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কোনো সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নিলে, সেই সম্পর্ক থেকে সরে আসা কোনো পুরুষের পরবর্তীতে ধর্ষণের অভিযোগে বিচার করা যাবে না।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এক রায় দেয়ার সময় এ কথা বলেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। উদ্বেগ প্রকাশ করে আদালত বলেছে, সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে ফৌজদারি আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। খবর হিন্দুস্তান টাইমসের

বিচারপতি বি ভি নাগারত্ন এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ বলেছে, ‘আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করছি- যেখানে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর, পুরোনো ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে কোনো বিষয়কে পরবর্তীকালে সহিংসতা বা যৌন নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।’

কেরালার একটি মামলার প্রেক্ষিতে এই রায় দেয়া হয়েছে। সেখানে এক ব্যক্তি একটি ধর্ষণ মামলায় নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের (ডিসচার্জ) আবেদন জানিয়েছিলেন। অভিযোগকারী নারী ১৯৯৬ সাল থেকে প্রায় সাত বছর ওই ব্যক্তির সঙ্গে বসবাস করেছিলেন। ওই নারী জানতেন যে, পুরুষটি আগে থেকেই বিবাহিত, তবুও তারা উভয়েই শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে সম্মত হয়েছিলেন। ২০০৩ সালে পুরুষটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং আট বছর পর ওই নারী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। নারীর দাবি ছিল, তিনি নিজেকে ওই ব্যক্তির বৈধ স্ত্রী মনে করেই শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।

১৫ বছর পর ওই ব্যক্তিকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে শীর্ষ আদালত বলেছে, ‘বর্তমান মামলাটি স্পষ্টতই পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্কের একটি উদাহরণ। হয়তো সামাজিক সমালোচনা বা কলঙ্ক এড়ানোর জন্য এটিকে বিয়ের রূপ দেয়া হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়।’

আদালত আরও বলেছে, ‘যখন পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিটি সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নিলে সেটিকে ধর্ষণের অভিযোগে পরিণত করা হয়, তখন তা কেবল অভিযোগের গুরুত্বকেই কমিয়ে দেয় না, বরং অপরাধের মূল অভিযোগটিকেই অর্থহীন করে তোলে।’ আদালত সতর্ক করে বলেছে, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে আবেগজনিত বিচ্ছেদের পর ফৌজদারি আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতাকে সমাজ ও আদালতের নিরুৎসাহিত করা উচিত।

বেঞ্চের হয়ে রায় প্রদানকারী বিচারপতি নাগারত্ন একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, আদালতকে অবশ্যই দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে- একটি হলো যেখানে প্রকৃতপক্ষে সম্মতির অভাব ছিল এবং যার ফলে যৌন নিপীড়ন ঘটেছে; আর অন্যটি হলো, যেখানে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর কোনো একজন সঙ্গী অতীতে দেয়া সম্মতির জন্য অনুশোচনা বোধ করছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, ‘আমাদের অবশ্যই জোর দিয়ে বলতে হবে যে, যেসব ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত, সেসব ক্ষেত্রে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে বিচার ব্যবস্থাকে যেন প্রতিশোধ নেয়ার হাতিয়ারে পরিণত করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

বিচারপতি নাগারত্ন বলেন, ‘কেউ কি বলতে পারে, সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার অধিকার ওই পুরুষের ছিল না? এমন সিদ্ধান্তকে কী প্রতারণা বা জালিয়াতি বলা যায়? নিশ্চয়ই না। কোনো সম্পর্ক টিকে থাকা অবস্থায় যে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, তা কেবল সম্পর্কটি তিক্ত হয়ে ভেঙে গেছে বলেই পরবর্তীকালে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে না।’

আদালত আরও জানায়, যখন কোনো নারী ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি তার স্বাধীনতা ও সুনাম- উভয়ই হারান। রায়ে বলা হয়েছে, ‘এ ধরনের ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার অপব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এবং নিন্দনীয়। তাই আদালতকে পুরো সম্পর্কটিকে কেবল শেষ পরিণতির দিক থেকে না দেখে, সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।’

আদালত এও বলেছে, ‘এ ধরনের মামলা চলতে দেয়া মানে ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার করা। এটি একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে, যেখানে সম্পর্কের ব্যর্থতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মানুষকে আইনি লড়াইয়ে টেনে আনা হবে।’

সব খবর দেখুন
মূলপাতায় ফিরে যান

সংবাদ খুঁজুন